vop-ad1

ভয়েস অব পটিয়াঃ শতবর্ষের ইতিহাস - ‘আবদুস সোবহান রাহাত আলী উচ্চ বিদ্যালয় নামক আলোর শিখা বিকীরণকারী বিদ্যায়তনটির - ২য় পর্ব

শতবর্ষের ইতিহাসঃ আবদুস সোবহান রাহাত আলী উচ্চ বিদ্যালয়; ‍asrahs; patiya; chittagong; chattogram; abdus sobhan; school; historical; পটিয়া; চট্টগ্রাম; মাওলানা আবদুস সোবহান; বিদ্যালয়; স্কুল; পটিয়ার স্কুল; চট্টগ্রামের স্কুল; ঐতিহ্যবাহী; শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান
শতবর্ষের ইতিহাসঃ আবদুস সোবহান রাহাত আলী উচ্চ বিদ্যালয় - ২য় পর্ব

শতবর্ষের ইতিহাস সিরিজ - ‘আবদুস সোবহান রাহাত আলী উচ্চ বিদ্যালয়’

১ম পর্ব পড়তে ক্লিক করুন

২য় পর্ব

৭. প্রধান শিক্ষক হিসেবে যাঁরা ছিলেন। বিদ্যালয়ে সর্বপ্রথম ১৯১৪ সাল থেকে ১৯১৮ সাল পর্যস্ত প্রথম প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন বিখ্যাত আইনবিদ নোয়াখালী নিবাসী আবদুল গোফরান বিএ.বিএল। তিনি পরে অবিভক্ত বাংলার মন্ত্রী হয়েছিলেন। বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠাকালীন সময় কে আজ পর্যন্ত স্বল্প ও দীর্ঘ মেয়াদে মোট ২৬ জন শিক্ষাবিদ প্রধান শিক্ষক পদে আসীন হয়েছেন। এঁদের মধ্যে চারজন দু’বার করে ভারপ্রাপ্ত হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। এই বিদ্যালয়কে সকল ধরণের সাফল্যের উচ্চ শিখরে আসীন করেছিলেন, ২৭ নভেম্বর ১৯৯৮ ইং তারিখে মৃত্যুর আগ মুহূর্ত পর্যন্ত দীর্ঘ ২৭ বছর পর্যন্ত বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী শিক্ষাবিদ মুহাম্মদ মুছা বি.এড স্যার। তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার নিদর্শন স্বরূপ বিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্ররা ‘শিক্ষাবিদ মুহাম্মদ মুছা স্মৃতি বৃত্তি’ প্রকল্প চালু করেছিলেন। বিদ্যালযের শতবর্ষ উদযাপন অনুষ্ঠানের জন্য ২০১৩ সালে উক্ত বৃত্তি অনুষ্ঠান বন্ধ রাখতে হয়েছিলো। কিন্তু ২০১৩ সালে শতবর্ষ অনুষ্ঠানটি হতে না পারলেও, “শিক্ষাবিদ মুহাম্মদ মুছা স্মৃতি বৃত্তি” আর চালু রাখা যায়নি। শতবর্ষ উদযাপনকালীন সময়ে একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা প্রধান শিক্ষক ছগীর মোহাম্মদ দায়িত্ব পালন করেছিলেন। তিনি ২০১৮ সালের ১২ মার্চ ইন্তেকাল করেন। স্কুলের বর্তমান বাস্তবতা হচ্ছে যে অভিজ্ঞ, দক্ষ ও শিক্ষা উদ্যোমী কোনো প্রধান শিক্ষক নিয়োগ দেয়া যাচ্ছে না কিংবা থাকছেন না। ২০১৮-১৯ সালের দিকে শরীফ সাহেব নামের একজন চৌকস প্রধান শিক্ষক আসলেও থাকলেন না। কিন্তু, উনি কেনো চলে গেলেন তা জানা যায়নি! বিদ্যালয় পরিচালনা পরিষদ যথাযথ যোগ্যতার প্রমাণ রাখতে না পারার কারণেই এমনটা হচ্ছে বলে সবাই মনে করেন। স্কুল পরিচালনা কমিটিতে, বর্তমানে যারা নির্বাচিত হয়ে আসেন তারা আবদুস সোবহান রাহাত আলী উচ্চ বিদ্যালয়ের মতো একটি বিদ্যালয় পরিচালনার মাধ্যমে শিক্ষার মান উন্নয়নে সত্যিকার কোনো যোগ্যতা রাখেন কিনা, এটা বর্তমান সময়ে সকলের প্রশ্ন। বাস্তবে, আবদুস সোবহান রাহাত আলী উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক থেকে শুরু করে জুনিয়র শিক্ষকদের শিক্ষা ও এক্সট্রা কারিকুলাম কার্যক্রম তদারক করতে পারেন বা পরামর্শ দিতে পারেন এমন কমিটি সদস্য কারা এসেছেন, বিগত কয়েকটি কমিটিতে, এ ব্যাপারে জানার, বলার এবং দাবী করার অধিকার সকল প্রাক্তন ছাত্রদের এবং স্কুল দরদীগণের রয়েছে; যাঁরা মৌলানা আবদুস সোবহান সাহেবের অবদানকে শ্রদ্ধার চোখে দেখেন। 

৮. বোর্ডের অধীনে চালু থাকা মাধ্যমিক সনদ পরীক্ষা ১৯৬২ সাল পর্যন্ত মেট্রিক, ২০০০ সাল পর্যন্ত এস.এস.সি, অতঃপর অদ্যাবধি পর্যন্ত গ্রেডিং পদ্ধতিতে এস.এস.সি হিসেবে স্বীকৃত। আরো আগে মেট্রিক পরীক্ষা, এন্ট্রান্স পরীক্ষা হিসেবে পরিচিত ছিলো। সে মতে আবদুস সোবহান রাহাত আলী উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ১৯১৮ সাল হতে ১৯৬২ সাল পর্যন্ত ৬৯৭ জন এনট্রান্স ও মেট্রিক পাশ, ১৯৬৩ সাল হতে ২০০০ সাল পর্যন্ত ৩,৬৪৯ জন ডিভিশান পদ্ধতিতে এস.এস.সি পাশ, ২০০১ সাল হতে ২০১৯ সাল পর্যন্ত ৩৫৭১ জন গ্রেডিং পদ্ধতিতে এস.এস.সি পাশ করে নিজ নিজ কর্মক্ষেত্রে সফলতার সাক্ষর রেখেছেন এবং রাখছেন। ২০১৫ হতে ২০১৯ সাল পর্যন্ত শুধুমাত্র শেষ পাঁচ বছরে মোট ১৩০১ জন পাশ করেন। আবদুস সোবহান রাহাত আলী উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্রদের পরীক্ষার ফলাফল নিয়ে অনেকজন বিদ্যালয় অন্তঃপ্রাণ শুভাকাঙ্খীগণের মনে দুঃখ, ব্যাথা ও হতাশা আছে। আবার উক্ত ফলাফল নিয়ে কারো কারো মুখ থেকে অতি সমালোচনাও শোনা যায়। সবাই বর্তমানে জিপিএ ৫ দিয়ে ফলাফল হিসাব করতে চান। বিদ্যালয়ের সর্বশেষ পাঁচ বছরের ফলাফলটা যাচাই করা যায়। এস.এস.সি ২০১৫ সালে ২৭২ জনে ২৩৫ জন, ২০১৬ সালে ২৮৪ জনে ২৭২ জন, ২০১৭ সালে ২৯৭ জনে ২৩৮ জন, ২০১৮ সালে ৩০৩ জনে ২২০ জন, ২০১৯ সালে ৩৯৬ জনে ৩৩৬ জন ছাত্র পাশ করেছে। অর্থাৎ পাঁচ বছরে মোট ১৩০১ জন ছাত্র পটিয়ার একটা বিদ্যালয় থেকে উত্তীর্ণ হওয়া সত্যিই গৌরবের। বিদ্যালয়ের সকল শিক্ষক শিক্ষয়িত্রীগণকে সর্বশেষ উক্ত পরিমাণ ছাত্রদেরকে পাশ করানোর জন্য বাহবা দিতে হয়, প্রশংসা করতে হয় এবং পুরষ্কৃত করতে হয়। 

বাস্তবে ৬ষ্ঠ শ্রেণীতে আবদুস সোবহান রাহাত আলী স্কুলে রাজনৈতিক নেতৃবর্গ, কমিটি সদস্য ও বিভিন্ন ব্যক্তির চাপ ও তদবীরে অতিরিক্ত ছাত্র এবং কম মেধাবী ছাত্র ভর্তি করানোর কারণে তাদেরকে প্রতিটি উপরের শ্রেণীতে উত্তীর্ণ করানো দুঃসাধ্যকর ব্যাপার হয়। পটিয়া সদরের অন্য কয়েকটি স্কুলের মতো বাছাই করে ছাত্র ভর্তি করানো যায় না, যদিওবা ভর্তি পরীক্ষা নেয়া হয়। ভালো ফলাফলটা কিভাবে প্রত্যাশা করা যায় ? আসলে বিদ্যালয়ের শিক্ষকদেরকে, গাধা পিটিয়ে ঘোড়া বানাতে হয়। শিক্ষকগণের একাডেমিক বা প্রাতিষ্ঠানিক কাজের ত্রুটি থাকলে নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সংশোধন কিংবা ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সোচ্চার হওয়া যায়। কিন্তু, তা নিয়ে রাজনীতি শোভন যেমন নয় তেমনি গ্রহণযোগ্যও নয়। সত্যটা হচ্ছে, বিদ্যালয়ের দু’একজন শিক্ষক বিদ্যালয় সংক্রান্ত বিষয় বহির্ভুত কর্মকান্ডে জড়িয়ে পড়ার কিছু প্রচার থাকলেও, সকল শিক্ষকদের উপর বদনামটা দেয়া পীড়াদায়ক। 

৯. প্রতিষ্ঠাকালীন সময় থেকে মৌলানা আবদুস সোবহান সাহেবের উৎসাহ ও অনুপ্রেরণায় বিদ্যালয়ের অপরাপর প্রতিষ্ঠাতাগণ, পরিচালনা পরিষদের সদস্যগণ, শিক্ষকমন্ডলী ও সহযোগীগণ বিদ্যালয়ের সফলতা ও প্রতিষ্ঠার জন্যে কি পরিমাণ কর্মনিষ্ঠ, ঐকান্তিক ও নিঃস্বার্থবান ছিলেন তার একটি তুলনামূলক নমুনা তথ্য তুলে ধরা হচ্ছে বিদ্যালয়ের সকল প্রাক্তন ছাত্রগণ ও শুভার্থীগণ গৌরব অনুভব করতে। ১৯১৮ সালে বিদ্যালয় থেকে ১ম বার ১৬ জন পরীক্ষার্থী মেট্রিক পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে ৭ জন প্রথম বিভাগ এবং ৩ জন দ্বিতীয় বিভাগে পাশ করেছিলেন। তন্মধ্যে ৪ জন নিজেদের কর্মদক্ষতা গুণে পরে বিখ্যাত হয়েছিলেন। সাবেক এম.পি নজরুল ইসলাম সাহেবের পিতা সাবেক স্কুল পরিদর্শক মরহুম আবদুর রহমান সাহেব তাঁদের একজন। 
উল্লেখ্য যে, বিদ্যালয় ১৯১৮ সালে ১ম বোর্ড পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে ২০১৯ সাল পর্যন্ত অধ্যবদি একবারও এস.এস.সি পরীক্ষায় অংশগ্রহণে বাদ পড়েছে বলে জানা যায়নি। অথচ ১৮৪৫ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়ে পার্শ্ববর্তী স্কুল ২২ বছর পর ১৮৬৭ সালে প্রথমবার বোডের্র পরীক্ষায় মাত্র ৩ জন অংশ নিয়ে ১ জন পাশ করতে পেরেছিলেন। ফলাফল সন্তোষজনক না হওয়াতে ১৮৮০ সাল পর্যন্ত ঐ বিদ্যালয়ের বোর্ড পরীক্ষায় অংশগ্রহণ বাতিল করে দেয়া হয়। পুনঃঅনুমতি পেয়ে ১৮৮১ সাল থেকে ১৮৮৫ সাল পর্যন্ত আবার ঐ বিদ্যালয় বোর্ড পরীক্ষায় অংশ নিয়েও কোন ফলাফল করতে পারেনি। ১৮৮৬ সালে হাইদগাঁও নিবাসী বিখ্যাত আইনজীবি অন্নদা চরণ দত্ত (৩ জনে ১ জন) ১ম বিভাগে পাশ করে ভালো ফলাফল করার পরের পর্ব থেকে বিখ্যাত কবি, সাহিত্যিক, ইতিহাসবিদ, গবেষক ঐ বিদ্যালয় থেকে পাশ করেছিলেন এবং দেশ ও জাতির জন্য অবদান রেখেছেন, রাখছেন। 

আবদুস সোবহান রাহাত আলী উচ্চ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সময় থেকেই উদ্যোক্তাগণ ও সম্পৃক্তগণকে, পটিয়ায় শিক্ষা প্রসারে নিঃস্বার্থ কর্মতৎপরতায় মৌলানা সাহেব যে কত বেশী উৎসাহ ও প্রেরণা সৃষ্টি করতে পেরেছিলেন, উল্লিখিত তথ্য তারই প্রমাণ। 

১০. আবদুস সোবহান রাহাত আলী উচ্চ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর থেকে বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সদস্য হিসাবে স্কুলের ধারাবাহিক অগ্রগতিতে যে সকল নিঃস্বার্থ ব্যক্তিগণ বিশেষ এবং গুরুত্বপূর্ণ অবদান ও ভুমিকা রেখেছিলেন তাঁদের মধ্যে অন্যতম সর্বজনাব আবদুর রহমান, মোখলেছুর রহমান, মাওলানা নুরুচ্ছফা, খলিল মাস্টার, মোঃ নজরুল ইসলাম এম.পি, এখলাছুর রহমান চেয়ারম্যান, ছিদ্দিক আহমদ চৌধুরী, ডাঃ কামাল উদ্দিন, হামিদুর রহমান, হামিদুল হক, গাজী আমিন শরীফ, হাজী কবির আহমদ সওদাগর, ডাঃ কে আখতার, বদিউর রহমান মাস্টার, অধ্যাপক মোঃ ইসহাক, আবদুল হক আল্লাই, মোঃ হানিফ, ব্যাংক ম্যানেজার আমির হোসেন প্রমুখগণ অগ্রগন্য। সদ্য সাবেক সভাপতি আলহাজ্ব মোহাম্মদ সোলাইমান সাহেব একটি অনবদ্য ভূমিকা রেখেছেন। অনেক শ্রদ্ধেয় জনের নামের সঠিক তথ্য না পাওয়ায় দেওয়া যায়নি। যাঁদের নামগুলি পেয়েছি এবং নাম দেয়া প্রয়োজন মনে করেছি তাঁদের নামগুলি দিয়েছি। আবার অনেকের নাম না দেওয়াটাই যুক্তিসঙ্গত।

চলবে..

লেখকঃ- স.ম ইউনুচ
বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ ও প্রাক্তন ছাত্র

৩য় পর্ব পড়তে ক্লিক করুন

বিঃদ্রঃ
(লেখাটি আবদুস সোবহান রাহাত আলী উচ্চ বিদ্যালয়ের শতবর্ষ উদযাপন স্মারকগ্রন্থের জন্য প্রস্তুতকৃত ছিলো। অনেকগুলো তথ্য সম্পাদন করে নতুনভাবে প্রকাশ করা হলো। ইতিহাসের সত্য অস্বীকার করা যায় না। যে কারো মতামত গ্রহণযোগ্য। - লেখক) 


আপনার মতামত জানাতে পারেন কমেন্টবক্সে কিংবা মেসেজ করুন আমাদের ফেসবুক পেইজে 

Share To:

Voice of Patiya

জানাতে পারেন আপনার মন্তব্য :

0 comments so far,add yours