vop-ad1

ভয়েস অব পটিয়াঃ শতবর্ষের ইতিহাস - ‘আবদুস সোবহান রাহাত আলী উচ্চ বিদ্যালয় নামক আলোর শিখা বিকীরণকারী বিদ্যায়তনটির - ৪র্থ পর্ব


শতবর্ষের ইতিহাসঃ আবদুস সোবহান রাহাত আলী উচ্চ বিদ্যালয়; ‍asrahs; patiya; chittagong; chattogram; abdus sobhan; school; historical; পটিয়া; চট্টগ্রাম; মাওলানা আবদুস সোবহান; বিদ্যালয়; স্কুল; পটিয়ার স্কুল; চট্টগ্রামের স্কুল; ঐতিহ্যবাহী; শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান
শতবর্ষের ইতিহাসঃ আবদুস সোবহান রাহাত আলী উচ্চ বিদ্যালয় - ৪র্থ পর্ব
শতবর্ষের ইতিহাস সিরিজ - ‘আবদুস সোবহান রাহাত আলী উচ্চ বিদ্যালয়’

১ম পর্ব | ২য় পর্ব | ৩য় পর্ব  

৪র্থ পর্ব

১৪. রাজনীতি দ্বারা যেহেতু দেশ ও সরকার চলে, তাই আবদুস সোবহান রাহাত আলী উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী যাঁরা সাম্প্রতিক সময়ে স্থানীয়ভাবে এবং জাতীয়ভাবে রাজনৈতিক দলসমূহের মূল দায়িত্বে থেকে দেশের মানুষের সেবা করছেন বলে বিশ্বাস করেন, সর্বজনাব আহমদ নুর, আলহাজ্ব মোতাহেরুল ইসলাম চৌধুরী, শামশুল আলম মাস্টার, শামশুদ্দিন আহমদ, স.ম. ইউনুচ (লেখক), মুহাম্মদ নুরুল হুদা, আইয়ুব বাবুল, অধ্যাপক হারুনুর রশীদ, এ.টি.এম মুহিবুল্লাহ চৌধুরী (মরহুম), এডভোকেট রফিকুল ইসলাম (মরহুম), কবিয়াল আবু ইউছুপ, নুরুল ইসলাম সওদাগর, কাজী এয়াকুব (মরহুম), সেলিম উদ্দিন, মুকিবুল ইসলাম ফারুক, মুহাম্মদ বদিউল আলম, আ.ম.ম টিপু সুলতান চৌধুরী, অধ্যাপক হারুনুর রশিদ, মুহাম্মদ ছৈয়দ চেয়ারম্যান, মোহাম্মদ আলী হেসেন, রেজাউল করিম রিজু (মরহুম) সহ আরো অনেকেই রাজনৈতিক মূলদল ও সহযোগী এবং অঙ্গ সংগঠনের নেতৃত্ব দিয়েছেন এবং দিচ্ছেন। 
বর্তমানে বিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের একটি অভিজ্ঞ ও যোগ্যতম অংশ প্রায় সকল রাজনৈতিক দলের বিভিন্ন স্তরে মূল নেতৃত্বে আসার পরবর্তী পর্যায়ে অবস্থান করছেন। মূল নেতৃত্বে এসে তাঁরাও ইতিহাসের অংশ হবেন। 

১৫. ** স্বাধীনতা মুক্তিসংগ্রামে আবদুস সোবহান রাহাত আলী উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্রদের মধ্যে যাঁদের নাম খুজে পাওয়া যায়, মুক্তিযোদ্ধা শামশুল আলম (বাহুলী) প্রথম পটিয়ায় মেট্রিক পরীক্ষা সেন্টারে বোমা ফাটিয়ে পাক হানাদারদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের সূচনা করেছিলেন বলে জানা যায়। তবে স্বাধীন বাংলাদেশে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের পরিচালিত সরকারের সময়ে বিমান বাহিনীতে চাকুরীকালীন অবস্থায় তিনি নিহত হলে তাঁর লাশটি খুঁজে পাওয়া যায়নি। 

বিদ্যালয়েরই সাবেক ছাত্র জনাব শামশুদ্দিন আহমদ মুক্তিযুদ্ধে বিশাল ভূমিকা রাখেন। এডভোকেট আবু ছৈয়দ সাহেব মুক্তিবাহিনীর কমান্ডার ছিলেন। বিদ্যালয়ের ছাত্র যাঁরা মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন তাদের মধ্যে সর্বজনাব সাবেক মেয়র শামশুল আলম মাস্টার, মরহুম শামশুল আলম চেয়ারম্যান (হাইদগাঁও), নুর মোহাম্মদ বিএসসি (ঐ), খায়ের আহমদ (ঐ), মোঃ মহিউদ্দিন চেয়ারম্যান (ঐ), আবু ছিদ্দিক (ঐ), মোস্তাফিজুর রহমান (উঃ গোবিন্দারখীল), আমির হোসেন (মল্ল পাড়া), ইঞ্জিনিয়ার আবুল কাশেম (গোবিন্দারখীল), মহিবুর রহমান (ঐ), আবুল কাশেম (ঐ), আবু তৈয়ব (ঐ), আহমদ ছফা চৌধুরী (হাবিবুর পাড়া) - আরো যাঁরা ছিলেন তাঁদের ব্যাপারে সঠিক তথ্য না পাওয়াতে নামগুলি যুক্ত করতে না পারার কষ্ট থেকে গেলো। 

মুক্তিযোদ্ধাদের নামের ব্যাপারে বিতর্ক থাকতে পারে। তবে, এই নিবন্ধ কোন সনদের প্রমাণপত্র নয়। আবদুস সোবহান রাহাত আলী উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্র মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে আমি যাঁদের নাম খুঁজে পেয়েছি, তাঁদের নামগুলোই যুক্ত করেছি । 

১৯৭১ সালের ১৬ এপ্রিল শুক্রবার সকাল ১১ টায় ১ম বার এবং দুপুর ১টায় ২য় বার পটিয়াতে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী জঙ্গী বিমানের মাধ্যমে পটিয়া থানার মোড়ে, আবদুস সোবহান রাহাত আলী উচ্চ বিদ্যালয়ে, পিটিআই - এ বোমাবর্ষণ করলে আবদুস সোবহান রাহাত আলী উচ্চ বিদ্যালয়ের বিজ্ঞান ভবন এবং তখনকার উত্তর পাশের ভবনটির ব্যাপক ক্ষতি সাধিত হয়। ঐদিনের বোমাবর্ষণে হাইদগাঁও গ্রামের ডা. সৈয়দ আহমদ, গোবিন্দারখীলের ফয়েজুর রহমান, ঈদুল মল্ল পাড়ার আমির আলী, হাবিবুর পাড়ার উম্মুল আলী, পোস্ট অফিস আধুরো বাড়ীর আবুল খায়ের, আল্লাই কাগজী পাড়ার আমিনুল হক, দক্ষিণ ভূর্ষির বিজয় দে, কাজী পাড়ার আলী আকবর, পশ্চিম গোবিন্দারখীলের নাছিমা খাতুন, কেলিশহরের দানু মিয়া,পশ্চিম গোবিন্দারখীলের ছৈয়দুল হক, রিক্শাচালক দুধু মিয়া সহ ২০ জন ব্যক্তি শহীদ হন বলে জানা যায়। 

১৬. আবদুস সোবহান রাহাত আলী উচ্চ বিদ্যালয়ে বর্তমানে ক্যাজুয়ালসহ ৩২ জন শিক্ষক মহৎ শিক্ষাদানের কাজে, ২ জন অফিস সহকারী, ১ জন গবেষণা সহকারী, ৩ জন ৪র্থ শ্রেণির কর্মচারী যাবতীয় প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। আর বর্তমানে বিদ্যালয়ের ছাত্রসংখ্যা প্রায় ১৮০০ জন। বিদ্যালয়ের গৌরবজনক ইতিহাস হচ্ছে ১৯৪৭ সালে দপ্তরী হিসেবে চাকুরীতে যোগদান করে জনাব গোলাপুর রহমান ১৩ নভেম্বর ১৯৯২ ইং তারিখে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত বিদ্যালয়ের জন্য নিরলস সেবা দিয়ে গিয়েছেন। জানা যায় যে, মৌলানা আবদুস সোবহান সাহেব বেনী মাধবকে (দপ্তরী) নিজে নিয়োগ দিয়েছিলেন। হাইদগাঁও নিবাসী বেনী মাধব মৃত্যুর আগ পর্যন্ত নিরলসভাবে প্রায় ৬০ বছর বিদ্যালয়ের সেবা দিয়ে মৌলানা সাহেবের সন্মান রক্ষা করে গিয়েছেন। বিদ্যালয়ের শিক্ষকগণের মধ্যে বাবু দেবেন্দ্র ধর (দেবেন্দ্র স্যার) স্বদেশী আন্দোলনে যুক্ত ছিলেন বলে জানা যায় এবং বিদ্যালয়ের একটি বড় পাঠাগার গড়ে তোলায় তাঁর একনিষ্ঠ ভুমিকা ছিলো। বিদ্যালয়ের শিক্ষক পদে এবং অপরাপর পদে থেকে যাঁরা দায়িত্ব পালন করে এই বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদেরকে লেখাপড়া শিখতে অবদান রেখেছিলেন তাঁদের সবার নাম ঠিকানাসহ তথ্য তুলে ধরতে পারলে অনুকরণীয় হতো। সময় ও সুযোগ না থাকায় সম্ভব হলো না। 

১৭. নৈসর্গিক ও অবকাঠামোগত অবস্থা কেমন তা জানা যেতে পারে। আবদুস সোবহান রাহাত আলী উচ্চ বিদ্যালয়ের বিশাল তোরণ দিয়ে ভিতরে ঢুকলেই নাক সোজা সামনে দ্বিতল শ্রেণীকক্ষসহ বিজ্ঞান ভবন, ডানে-বামে দুটি ছোট মাঠ, বামদিকের মাঠের দক্ষিণে দ্বিতল শ্রেণীভবন। ডানদিকের মাঠের উত্তরে নতুন চারতলা ভবনে প্রধান শিক্ষকের কক্ষ, অফিস কক্ষসহ শিক্ষক কক্ষ ও শ্রেণীভবন। সামনে এগিয়ে গেলে পিছনে পড়বে দ্বিতল শ্রেণীভবন। সামনে-বামে বিশাল বিদ্যালয় হলঘর। ঘুরে বিজ্ঞান ভবনের পিছনের দিকে গেলে বিদ্যালয় খেলার মাঠ, খেলার মাঠের উত্তর দিকে দ্বিতল শ্রেণীভবন, বিদ্যালয়ের উত্তর পাশে পুকুরের পাড়ে শুয়ে আছেন পটিয়ায় শিক্ষা প্রসারের অগ্রদূত ও বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা মৌলানা আবদুস সোবহান সাহেব। মৌলনা সাহেবের পাশে তাঁর স্ত্রীর কবরটিও রয়েছে। বিদ্যালয়ের বিজ্ঞান ভবন, অফিস ভবন ও পূর্ব পাশের দ্বিতল ভবনের সামনে রয়েছে দৃষ্টিনন্দন শহীদ মিনার যা বিদ্যালয়ের ১৯৯১ ব্যাচের ছাত্রগণ তাদের নিজস্ব উদ্যোগে এবং অর্থে নির্মাণ করে দেন, বিদ্যালয়ের অনুমতি নিয়ে। স্কুলের সামনে আরাকান সড়কের পাশ ধরে মূল ফটকের দুই ধারে দ্বিতল ভবনের সবগুলি দোকানসমূহ স্কুল মালিকানাধীন ছিলো। বর্তমানে গেইটের দক্ষিণ পাশের মার্কেটসহ দোকানগুলি ভেঙ্গে ফেলা হয়েছে। অনেকের মতে এই মার্কেটের কারণে স্কুলের সৌন্দর্য নষ্ট হয়েছে ও স্কুল ব্যবসার দিকে ঝুকেছে। আবার কেউ কেউ মনে করেন যে, এই মার্কেটের কারনে গাড়ীর শব্দ দূষণ থেকে স্কুল নিরাপদ হয়েছে। স্কুলের প্রাক্তন ছাত্র ও শুভাকাঙ্খী বোদ্ধা জনেরা অনেকেই মনে করেন, দোকান ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের কারণে স্কুলের লেখাপড়ার মানের অবনমন ঘটেছে। স্কুল দরদীগণ মনে করেন, পরিচালনা কমিটির কিছু সদস্য ঐ ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থেকে আর্থিক সুবিধা লাভের জন্যে স্কুল কমিটিতে নির্বাচিত হতে চান। শিক্ষার মান রক্ষা ও অগ্রগতির জন্যে বেশীরভাগ সদস্য আসেন না বলে প্রায়ই শুভাকাঙ্খীরা মত প্রকাশ করেন। মৌলানা আবদুস সোবহান সাহেবের অনেক কষ্ট ও ত্যাগে প্রতিষ্ঠিত স্কুলের পরিচালনা কমিটির সদস্যদের বিরুদ্ধে বা শিক্ষক কর্মচারীদের বিরুদ্ধে কোনো আর্থিক অনিয়ম কিংবা অপকর্মের অভিযোগ উত্থাপিত হলে, এর চেয়ে অপমান, অসন্মান, লজ্জাকর ও আত্মঘাতী আর কিছু হতে পারে না।

১৮. মৌলানা আবদুস সোবহান ও রাহাত আলী দারোগা সম্পর্কে যা জানা যায়। মৌলানা আবদুস সোবহান সাহেব জন্মগ্রহণ করেছিলেন ১৮৫৩ সালের ১১ জানুয়ারী, চট্টগ্রাম জেলার পটিয়া পৌরসভার উত্তর গোবিন্দারখীল গ্রামের মুন্সি বাড়ী নামক পাড়াতে। তাঁর পিতার নাম মুন্সি আলী আকবর। মৌলানা সাহেব মারা যান ১৯১৮ সালের ৭ মে। ব্যক্তিগত জীবনে ওয়াজ নসিহত ও শিক্ষকতা করতেন। রাহাত আলী দারোগা সাহেব জন্মগ্রহণ করেন চট্টগ্রাম জেলার ফটিকছড়ি উপজেলার নানুপুর গ্রামে। পটিয়া থানায় দারোগা হিসেবে চাকুরী করতেন। তাঁর জন্মের সন তারিখ খুঁজে পাওয়া যায়নি। সাবেক প্রধান শিক্ষক মুহাম্মদ মুছা (বি এড) স্যার এর অনুরোধে স্কুল শিক্ষক বীর মুক্তিযোদ্ধা ছগীর মোহাম্মদ সাহেবের উদঘাটিত তথ্য অনুযায়ী রাহাত আলী দারোগা মারা যান ১৯৪৩ সালে, শনিবার। তারিখ জানা গিয়েছে বাংলা ১ ভাদ্র। দারোগা সাহেব নিঃসন্তান অবস্থায় মারা যান। তাঁর পিতার নাম রহমত আলী সওদাগর বলে জানা গিয়েছে।

চলবে..

৫ম (শেষ) পর্ব পড়তে ক্লিক করুন

লেখকঃ- স.ম ইউনুচ
বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ ও প্রাক্তন ছাত্র


বিঃদ্রঃ
(লেখাটি আবদুস সোবহান রাহাত আলী উচ্চ বিদ্যালয়ের শতবর্ষ উদযাপন স্মারকগ্রন্থের জন্য প্রস্তুতকৃত ছিলো। অনেকগুলো তথ্য সম্পাদন করে নতুনভাবে প্রকাশ করা হলো। ইতিহাসের সত্য অস্বীকার করা যায় না। যে কারো মতামত গ্রহণযোগ্য। - লেখক) 


আপনার মতামত জানাতে পারেন কমেন্টবক্সে কিংবা মেসেজ করুন আমাদের ফেসবুক পেইজে 

Share To:

Voice of Patiya

জানাতে পারেন আপনার মন্তব্য :

0 comments so far,add yours